নীল জল আর লাল ছাদের ক্রোয়েশিয়ায়

১৯৯৪ এর ফুটবল বিশ্বকাপের আগে ক্রোয়েশিয়ার নামও শুনিনি। পরে অবশ্য জানতে পেরেছি দেশটিকে, যেটি ১৯৯১ সালে যুগোস্লাভিয়া থেকে আলাদা হয়েছিল। কিন্তু, সেখানে যাবার কথা স্বপ্নেও কখনো ভাবিনি। যাই হোক, ভিসা-টিকিটের হ্যাপা সামলে মাস খানেকের মধ্যেই জাপানের ইয়োকোহামা শহর থেকে উড়াল দিলাম ক্রোয়েশিয়ায়।

স্প্লিট বিমানবন্দরে রাতের বেলা নেমে একটা বাসে চেপে আমাদের হোটেল ‘পিঙ্ক ইন’এ পৌঁছলাম আর অপেক্ষায় রইলাম পরদিন সকালের।
ভোরবেলায় ব্যালকনিতে এসেই সামনে বিশাল নীলের চাদর দেখতে পেলাম। সাগরের জল কতটা নীল হতে পারে, অ্যাড্রিয়াটিক সাগর না দেখলে ধারণা করা যাবে না। আর এতোই স্বচ্ছ যে পানির কাছে গিয়ে ছোট ছোট মাছের ঝাঁক দেখতে পেলাম। মৎস্য সম্পদ ক্রোয়েশিয়ার অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হওয়ায় সাগরের পানি পরিষ্কার ও দূষণমুক্ত রাখাকে সরকার অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে থাকে।
নিচে নেমে এসে সমুদ্রতটে বেড়ালাম, পা ভেজালাম সাগরের পানিতে আর ছবি তুললাম অনেক। সৈকতের পাশে রয়েছে অমসৃণ লালচে-শাদা পাথরের ছোট ছোট টিলা আর পাইন-জাতীয় গাছের সারি।
কনফারেন্সের ফাঁকে স্প্লিট শহর দেখতে বের হলাম। ডালমেশিয়া প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত স্প্লিট ক্রোয়েশিয়ার দ্বিতীয় বড় শহর। বেশ গোছানো, ছিমছাম। বাড়ির ছাদে উজ্জ্বল লাল রঙের ব্যবহার নজর কাড়ে। পরে দেখেছি, স্প্লিটসহ ক্রোয়েশিয়ার কয়েকটি শহরকে অনেক ভ্রমণকারী ‘সিটি অব রেড রুফস’ নাম দিয়েছেন।
অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের অন্য পাশেই ইতালি, তাই রকমারি পিজ্জা পাওয়া যায় এখানেও। চোখ-ধাঁধানো ক্রোয়েশিয়ান সুন্দরীদের পাশাপাশি বাহারি টাই-পরা সুদর্শন তরুণ-যুবাদের ভিড় চারদিকে। ষোল শতকের শেষের দিকে এই ক্রোয়েশিয়া থেকেই সর্বপ্রথম ‘ক্রাভাট’ নামের এক ধরণের নেকটাই গোটা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়েছিলো।
ঘুরতে ঘুরতে ওল্ড টাউনে এসে পড়লাম। রোমান সম্রাট ডায়োক্লেশিয়ান চতুর্থ শতাব্দীতে এখানে তার প্রাসাদ বানিয়েছিলেন। ১৯৭৯ সালে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের তালিকায় ঢুকে পড়া এই প্রাসাদ আয়তনে বিশাল, মনোমুগ্ধকর। ২০১৩ সালে টেলিভিশন সিরিজ ‘গেমস অব থ্রন্স’ এর শুটিং হয়েছিল এখানে।
দেখার আছে অনেক কিছু। তার মধ্যে ৩৫০০ বছরের পুরনো মিশরীয় স্ফিংক্স, রোমান আমলের পাথর-বাঁধানো ফুটপাত, গ্রীকদেবতা জুপিটারের মন্দির, গ্রেগরি অব নিন-এর ২৮ ফুট দীর্ঘ ভাস্কর্য, গোল্ডেন গেইট, সেইন্ট ডমনিয়াসের ক্যাথেড্রাল আর ঘণ্টাঘর (বেল টাউয়ার) ভালো লাগলো। ১৮৭ ফুট উচ্চতার ঘণ্টাঘরে সরু লোহার সিঁড়ি বেয়ে ওঠার রোমাঞ্চ ভোলার নয়, পুরো শহর দেখা যায় ওখান থেকে।
গ্রেগরি অব নিন একজন বিশপ ছিলেন, ওনার ভাস্কর্যের পায়ের বুড়ো আঙ্গুল স্পর্শ করে টুরিস্টদের ছবি তুলতে দেখে জানতে পারলাম, তাতে নাকি সৌভাগ্য আসে। এই কুসংস্কারের কারণে ভাস্কর্যের অন্যান্য অংশের তুলনায় ওই আঙ্গুলটা রীতিমত চকচক করছে!
সবচেয়ে বেশি আনন্দ পেলাম রোমান সৈনিকের সাজে সজ্জিত দুটি তরুণের সাথে ছবি তুলতে পেরে। সে বাবদ কুড়ি কুনা (ক্রোয়েশিয়ার  মুদ্রা) পেয়ে ওরা দুজনও মহা খুশি। শুধুই বলে, ‘হভালা’ (ধন্যবাদ)! মানুষজন ইংরেজিতে খুব একটা স্বচ্ছন্দ নন। নেট ঘেঁটে শিখে আসা কয়েকটি বুলি সম্বল করে আন্ডারগ্রাউন্ড মার্কেটে টুকটাক কেনাকাটা সেরে বাসে চেপে ফিরতি পথ ধরলাম
কনফারেন্সে গবেষণাকর্ম উপস্থাপন করার পর ডিনারের টেবিলে বসেই উপভোগ করলাম ‘ক্লাপা’ আর ‘গ্যাঙ্গা’, ক্রোয়েশিয়ার ঐতিহ্যবাহী নাচ-গান। চড়া সুরে খুব প্যাশনের সাথে গাওয়া দ্রুত লয়ের গানের সঙ্গে নারী ও পুরুষেরা নাচলেন, তাদের মধ্যে বোঝাপড়াও চমৎকার। পাশে বসা ক্রোয়েশিয়ান অধ্যাপক ও তার ছাত্রীর কাছে শুনলাম, পরিবেশনকারী দলটির ক্রোয়েশিয়ায় বেশ নামডাক আছে।
আরও জানতে পারলাম, ক্রোয়েশিয়ার মূল পর্যটন আকর্ষণ হলো- ওয়াটারফল, ব্লু লেগুন আর বড় বড় লেক। অসামান্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা জায়গাগুলোর ছবি দেখেই এ যাত্রায় ক্ষান্ত হতে বাধ্য হলাম। কারণ পরদিন দুপুরেই আমার জাপান ফেরার ফ্লাইট।
কয়েক দিনে একটিমাত্র শহর দেখে গোটা দেশ সম্পর্কে ধারণা করা অসম্ভব, অনুচিতও। ক্রোয়েশিয়ার আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা বৈচিত্র্যের নাগাল না পেলেও পাহাড়-সমুদ্র-ঝর্ণার স্বর্গীয় সৌন্দর্য আর বলকান সভ্যতার ইতিহাস-ঐতিহ্যের মিশেল মনটা ঠিকই ভরিয়ে দিলো। জাপানের পথে ফিরে চললাম রঙিন স্মৃতিগুলো সাথে নিয়ে।
লেখক: পিএইচডি গবেষক, ইয়োকোহামা সিটি ইউনিভার্সিটি, জাপান

Post a Comment

[blogger]

MKRdezign

{facebook#YOUR_SOCIAL_PROFILE_URL} {twitter#YOUR_SOCIAL_PROFILE_URL} {google-plus#YOUR_SOCIAL_PROFILE_URL} {pinterest#YOUR_SOCIAL_PROFILE_URL} {youtube#YOUR_SOCIAL_PROFILE_URL} {instagram#YOUR_SOCIAL_PROFILE_URL}

Contact Form

Name

Email *

Message *

Powered by Blogger.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget